অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় ব্র্যাডম্যানকে স্টাম্পড করেছিলেন প্রবীর সেন!

Spread the love

প্রাণবন্ত মানুষটার ক্রিকেটই ছিল প্রাণ। কে ভেবেছিল, ক্লাব ক্রিকেট খেলে ওঠার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তিনি জীবনের বাইশ গজকেই বিদায় জানাবেন!

সৌরাংশু দেবনাথ, কলকাতা: প্রাণবন্ত মানুষটার ক্রিকেটই ছিল প্রাণ। কে ভেবেছিল, ক্লাব ক্রিকেট খেলে ওঠার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তিনি জীবনের বাইশ গজকেই বিদায় জানাবেন!

তারিখটা ১৯৭০ সালের ২৬ জানুয়ারি। প্রজাতন্ত্র দিবসের সকালে তখনও ম্যাচ শুরুর কিছুক্ষণ বাকি। হঠাৎই বিপক্ষের ড্রেসিং-রুমে হাজির প্রবীর সেন, ময়দানে যিনি খোকন নামেই বেশি পরিচিত। বছর কুড়ির এক তরুণের মুখে হালকা দাড়ি কাড়ল নজর। ঠাট্টা করার লোভ সামলানো মুশকিল। গম্ভীর সুরে তাই বলে ওঠা, ‘এ কী! দাড়ি মুখে কেউ ক্রিকেট খেলে নাকি?’ উলটোদিকের তরুণ অবশ্য দমে যাওয়ার পাত্র নন। পলকের মধ্যে এল পালটা মন্তব্য, ‘ডব্লু জি গ্রেসের নাম শোনেননি নাকি?’ ড্রেসিং-রুম মুহূর্তে স্তব্ধ। সেই সময় প্রবীর সেনকে এমন কথা শোনানো সহজ নয়। ভারতের হয়ে কিপার হিসাবে ১৪টা টেস্ট খেলেছেন। ডন ব্র্যাডম্যানকে স্টাম্পডও করেছেন প্রথম শ্রেণির ম্যাচে, যা বিরল কৃতিত্ব। বাস্তবে, ভারতীয় ক্রিকেটের প্রথম ‘গ্রেট উইকেটকিপার’ তিনিই।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলেছেন বছর পনেরো। তারপর নেন অবসর। এবার শুধুই ক্লাব ক্রিকেট। কিন্তু সেখানেও দাপটের অভাব ছিল না। সেই সকালে পরিস্থিতি সামলাতে কেউ কেউ তাই পরিচয় করানোর ভঙ্গিতে শোনালেন, ‘এ হল দেব মুখার্জির ভাই রাজু।’ প্রবীর সেন অবশ্য গায়ে কিছুই মাখেননি। এবার সেই তরুণকেই কাছে টানলেন আদর করে, ‘কিছু মনে করিস না। মজা করছিলাম।’ তাৎপর্যের হল, কিংবদন্তি কিপারের জীবনের শেষ শিকারও ওই তরুণ, রাজু মুখার্জি। ডানদিকে ঝাঁপিয়ে নেন ক্যাচটা। যে মানের কিপার ছিলেন, তাতে মোটেই কঠিন ছিল না। কিন্তু ভালো কিপারের পাশাপাশি তিনি উচ্চাঙ্গ শোম্যানও। তাই বেশ কয়েকবার গড়াগড়ি দেন রাজুর খোঁচা ধরে। কে জানত, এই দৃশ্য আর দেখা যাবে না সবুজ ঘাসে!
প্রবীর সেনের জীবনে ২৭ জানুয়ারির সকাল আর আসেনি। সেই রাতেই হয় স্ট্রোক। না-ফেরার দেশে পাড়ি দেন তিনি। অকস্মাৎ প্রয়াণে ময়দানে নেমে আসে বিষাদ। অনেকের কাছেই তা অবিশ্বাস্য মনে হয়। আগেরদিনই যে দিব্যি মাঠে নেমেছিলেন তিনি!
পদ্মাপাড়ের কুমিল্লায় জন্মানো প্রবীরের এবছর জন্মশতবর্ষ। জাতীয় দলে তিনিই প্রথম বাঙালি ক্রিকেটার। সেই সময় টানা কয়েক বছর দেশের একনম্বর কিপারও বঙ্গসন্তান। সুনীল গাভাসকরের মামা মাধব মন্ত্রী ছাড়াও নানা জোশির সঙ্গে চলত লড়াই। কিন্তু কিপিং দক্ষতায় প্রবীর পিছনে ফেলে দেন সবাইকে। রনজি অভিষেক হয়েছিল মাত্র ১৭ বছর বয়সে। মেলবোর্নে টেস্ট অভিষেকের সময় বয়স ২২। তবে তার আগেই অ্যাডিলেডে ব্র্যাডম্যানকে বিদ্যুৎগতিতে স্টাম্প করেছিলেন। বোলার ছিলেন ভিনু মানকড়। চোখের পলক ফেলার আগেই বেল ফেলে দেন প্রবীর। এমন ক্ষিপ্রগতিতে অবাক হয়েছিলেন খোদ ডনও। সাধারণত, স্টাম্পড হতেন না তিনি। টেস্ট ক্রিকেটে ৮০ ইনিংসে একবারও এভাবে ফেরেননি ব্র্যাডম্যান। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে মোট ২৯৫ বার আউট হন তিনি। তারমধ্যে স্টাম্পিং মাত্র ১১টি। সেজন্যই এটা প্রবীরের জীবনের সেরা কীর্তি বটেই, রীতিমতো বিরল ঘটনাও! 
টেস্ট কেরিয়ারে ২০টি ক্যাচ ও ১১টি স্টাম্পিংয়ের নীরস তথ্যে অবশ্য তাঁকে মাপা মুশকিল। ডনের দেশে তাঁর কিপিং প্রবল  সাড়া ফেলেছিল। সেই সময় টেস্টে স্টাম্পিংয়ের রেকর্ড ছিল অজি কিপার বার্ট ওল্ডফিল্ডের। কিংবদন্তি সেই কিপার মুগ্ধতা থেকেই একজোড়া গ্লাভস উপহার দেন প্রবীরকে। সেই সিরিজে শেষ টেস্টে অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংসে তোলে ৫৭৫। কিন্তু প্রবীর ‘বাই’ দেন মাত্র ৪টি। ১৯৫২ সালে চিপকে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে এক ইনিংসে ৪টি স্টাম্পিংও সাড়া ফেলেছিল। সেই সময় ওল্ডফিল্ড ছাড়া এই নজির কারও ছিল না। ভাবা যায়নি, সেবছরই ডিসেম্বরে জীবনের শেষ টেস্ট খেলবেন তিনি। সেটাও ইডেনে! বিস্ময়ের হল, প্রবীরের নামের পাশে প্রথম শ্রেণিতে রয়েছে একটা হ্যাটট্রিকও। বোলিং গড় ছিল ৩.৪-১-৪-৩!
বঙ্গ ক্রিকেট অবশ্য ভোলেনি এই বিরল প্রতিভাকে। তাঁর নামাঙ্কিত ট্রফিতে খেলেছেন কপিল দেব, শচীন তেন্ডুলকর, মহেন্দ্র সিং ধোনি, বিরাট কোহলি, চামিন্ডা ভাসের মতো নক্ষত্র। সৌরভ গাঙ্গুলির নামও রয়েছে তালিকায়। আসলে এমন বর্ণময় ক্রিকেটার ক্ষণজন্মা। ম্যাচ খেলে উঠে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যুও যে দুর্লভ! 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *