কেন নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের দাবি উঠছে?

Spread the love

২৪ অক্টোবর সারা বিশ্বে পালিত হয় রাষ্ট্রসংঘ দিবস। ৮০ বছর আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী ধ্বংসস্তূপ থেকে জন্ম নিয়েছিল এই বিশ্বমঞ্চ।

২৪ অক্টোবর সারা বিশ্বে পালিত হয় রাষ্ট্রসংঘ দিবস। ৮০ বছর আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী ধ্বংসস্তূপ থেকে জন্ম নিয়েছিল এই বিশ্বমঞ্চ। মানবসভ্যতা যেন আর কখনো নরককুণ্ডে না যায়, সেই আশার আলো জ্বালিয়েই এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু এই সময় দাঁড়িয়ে সেই আশার আলো কি আর আগের মতো জ্বলছে? কেমন আছে বিশ্বশান্তির কাণ্ডারি?

যে রাষ্ট্রসংঘ একসময় গোটা বিশ্বকে শান্তি ও সুরক্ষার আশ্বাস দিয়েছিল, আজ তা এক বিশাল আমলাতান্ত্রিক জালে আটকে পড়েছে। বর্তমানে বিশ্বের নানা প্রান্তে যখন যুদ্ধ চলছে, তখন এই সংস্থাকে যেন বড়ো অসহায় বলে মনে হয়। বিশেষ করে এর প্রাণকেন্দ্র নিরাপত্তা পরিষদ যেন এক সেকেলে ঘেরাটোপে বন্দি। বর্তমানে নিরাপত্তা পরিষদে থাকা স্থায়ী সদস্য হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া ও ব্রিটেন। এই পাঁচটি দেশের হাতে বিশেষ ক্ষমতা বা ভেটো পাওয়ার অনেক সময় শান্তির বদলে যুদ্ধ থামানোর প্রচেষ্টাকেই থমকে দেয়। তাই প্রশ্ন উঠেছে, আশি বছর আগের নিয়মে চলা এই পরিষদ কি আদৌ আজকের একুশ শতকের দুনিয়াকে সামলাতে পারে?

বর্তমান পৃথিবীর মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, রাষ্ট্রসংঘের সদস্য প্রায় ১৯৩টি দেশ। কিন্তু এই বিশাল পরিবারের ভেতরে ক্ষমতার ভারসাম্যের এক অদ্ভুত বৈষম্য রয়েছে। এর মূল চালিকাশক্তি নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্য দেশগুলি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক পরেই রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সামনে রেখে এই পাঁচটি দেশকে সমস্ত ক্ষমতা দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আর এই পাঁচটি দেশের হাতেই রয়েছে সেই ক্ষমতা, যার বলে তারা যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবে একা সিদ্ধান্ত নিয়ে ভেটো দিতে পারে।

অথচ এই সময়ে যুদ্ধ থামাতে রাষ্ট্রসংঘ যে সম্পূর্ণ ব্যর্থ, তা আজ দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। পৃথিবীর এক কোণে যখন রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালিয়ে মাসের পর মাস ধ্বংসলীলা চালায়, কিংবা অন্য প্রান্তে ইরানে মার্কিন-ইজরায়েল আক্রমণে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন, তখন রাষ্ট্রসংঘ কেবল দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। কোনো বড়ো শক্তি যখন নিজের স্বার্থে যুদ্ধ শুরু করে, তখন সেই দেশের বিরুদ্ধে বা তাদের বন্ধু দেশের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা রাষ্ট্রসংঘের থাকে না। কারণ নিরাপত্তা পরিষদে বসা ওই পাঁচটি দেশের একজনের হাতেই তো ভেটো পাওয়ার রয়েছে। তারা নিজেকে বা বন্ধুদের বাঁচানোর জন্য সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে প্রস্তাব আটকে দেয়। এর ফলে যুদ্ধ থামানো তো দূরে থাক, শান্তি ফেরানোর সমস্ত প্রচেষ্টাই মাঝপথে থমকে দাঁড়ায়। এই অক্ষমতা আজ বিশ্ববাসীর সামনে রাষ্ট্রসংঘের কার্যকারিতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

শুধু তাই নয়, বিগত বহু দশক ধরে সমালোচকদের মুখে একটি কথা খুব জোরালোভাবে শোনা যায় যে রাষ্ট্রসংঘ অনেক ক্ষেত্রেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা পরিচালিত। এর সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ মেলে নানা সংকট ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তে। সারা বিশ্বের প্রতি আমেরিকার নীতি অবস্থানের বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে কোনো বড়ো পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রসংঘ প্রায় সময়ই অক্ষমতার পরিচয় দেয়। ঠান্ডা লড়াইয়ের সময় থেকে শুরু করে পরবর্তী বিভিন্ন সময় দেখা গেছে, আমেরিকার অর্থনৈতিক শক্তি, বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর এর প্রভাব এবং এর সদর দফতর নিউ ইয়র্কে অবস্থিত হওয়ার কারণে মার্কিন ভূরাজনীতির সরাসরি প্রভাব পড়ে এই সংস্থার সিদ্ধান্তের ওপর। আমেরিকা যখন কোনো দেশে এককভাবে হস্তক্ষেপ করে কিংবা তার কোনো ঘনিষ্ঠ মিত্রের বেলায় আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘিত হয়, তখন রাষ্ট্রসংঘের পক্ষ থেকে যতটা জোরালো প্রতিবাদ বা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা, তা দেখা যায় না। অন্যদিকে, মার্কিন নীতির বিরুদ্ধাচরণকারী দেশগুলোর ওপর দ্রুত নিষেধাজ্ঞা বা কঠোর পদক্ষেপের খড়্গ নেমে আসে। এই সমস্ত ঘটনা প্রমাণ করে যে, এই আন্তর্জাতিক সংস্থাটি নিরপেক্ষভাবে সমস্ত সদস্যের স্বার্থ দেখার চেয়ে অনেক সময় মহাশক্তিধর আমেরিকার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক এজেন্ডার মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *